নীতি সুদহার অপরিবর্তিত

নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে চাপ কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। নীতি সুদহার রাখা হয়েছে ১০ শতাংশ।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। নীতি সুদহার রাখা হয়েছে ১০ শতাংশ। প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও এ সময়ে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। আর দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১৭ শতাংশ। প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধে একই নীতি সুদহার ধরে রাখার পেছনে যুক্তি দেয়া হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের। প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধে একই রাখা হয়েছে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে বাজারে অর্থের জোগান কমাচ্ছে। বাস্তবতা হলো শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য যেসব বিষয় রয়েছে সব সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হলো বেসরকারি খাত। শিল্পের উৎপাদন, বিপণন কিংবা সেবা খাতের সিংহভাগই বেসরকারি খাতনির্ভর। সরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে খাতটিকে ঋণবঞ্চিত করা হচ্ছে। যদিও মূল্যস্ফীতি না কমে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন আরো বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। খেলাপি ঋণ বেড়ে ব্যবসায়ীরা আরো নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে শীতকালীন সবজির দাম কমার প্রভাবে গত মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছিল। তবে এ প্রভাব ক্ষণস্থায়ী, মৌসুম শেষ হয়ে গেলেই সবজির দাম আবার বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের দাম তো ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায়ই রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোয় মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে প্রত্যাশা বাস্তবতার নিরিখে সেটি কতটুকু বাস্তবসম্মত তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

  • অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেগবান করার ক্ষেত্রে মুদ্রানীতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। তারা মুদ্রানীতির মাধ্যমে আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও তা অর্জনে কাজ করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির ক্রিয়াকলাপের জন্য একক ক্ষমতার নীতি সুদহারের পাশাপাশি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বিশেষ রেপো বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা ও সুদহার করিডোরের নিম্নসীমা রিভার্স রেপো বা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)। বর্তমানে এসএলএফ ও এসডিএফের সুদহার যথাক্রমে ১১ দশমিক ৫ ও ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সাধারণত মুদ্রানীতির অন্যতম কাজ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা। ভোগ্যপণ্যের মূল্যস্তর, বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতিকে গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়। বলা যায়, মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা মোকাবেলা করা হয়। একই উদ্দেশ্য নিয়েই প্রণয়ন করা হয়েছে দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি। শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। এভাবে উচ্চ সুদহার বিদ্যমান থাকা অবস্থায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া বেসরকারি খাতে চাপ আরো বাড়বে। সুদহার বেশি থাকায় ঋণ নেয়ার প্রবণতা কমবে। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমলে বিনিয়োগ কম হবে। কর্মসংস্থানও কম তৈরি হবে।
  • মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ধরনের মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য হলো বাজারে অর্থের প্রবাহে লাগাম টেনে চাহিদা কমিয়ে ফেলা। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়, পণ্যের চাহিদা কমে যায়। ফলে মূল্যস্ফীতির হারও কমে যায়। আরেকটি পদক্ষেপ হলো সুদহার বাড়িয়ে মুদ্রাকে ব্যয়বহুল করে তোলা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিগত সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। কয়েক মাস ধরে সবাই নীতি সুদহার কমানোর দিকে হাঁটছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোয় মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে অতিরিক্ত তারল্য প্রভাব নয়, বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই পণ্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে প্রভাব ফেলছে। দেশে প্রধান প্রধান কয়েকটি নিত্যপণ্যের বাজারে তৈরি হয়েছে অলিগোপলি। যেখানে প্রতিযোগিতা নয়, পণ্যের বাজারদরকে নিয়ন্ত্রণ করছে হাতেগোনা কয়েকটি আমদানিকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। মুদ্রানীতির উপকরণগুলো ঠিকমতো কাজ করে না। এর প্রধান কারণ রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ের অভাব। তাছাড়া বাংলাদেশে মুদ্রানীতির চেয়ে বাজারের প্রভাব বেশি। এক্ষেত্রে মুদ্রানীতি ব্যবহার করলে খুব বেশি সুফল মিলবে না বলে মনে হচ্ছে। কারণ চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল তাও পূরণ হয়নি। তবে সরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হয়েছে।
  • মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক নীতি হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাত বেশি ভোগান্তির সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিরাট অংশ অনানুষ্ঠানিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে তাদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বেসরকারি বিনিয়োগ। নানা পদক্ষেপ নিয়েও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো যাচ্ছে না। অর্থের প্রবাহ কমাতে গিয়ে বিনিয়োগের অর্থ সংকট যেন তৈরি না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। কারণ বিনিয়োগ হ্রাস পেলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।
  • একদিকে কমছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে বাড়ানো হয়েছে ব্যাংক ঋণের সুদহার। দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার বাড়িয়ে অর্থ সরবরাহ সীমিত রাখা তথা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের এ চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়েছে, যা পক্ষান্তরে মূল্যস্ফীতিকেই উসকে দিচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম আরো বাড়ছে। আবার ব্যবসায়িক মন্দা ও সুদহার বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হওয়ার মুখে। এতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুটিই বাড়ছে, ব্যাংক খাতের সংকট আরো তীব্র হচ্ছে।
  • এছাড়া গত জানুয়ারিতে দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, গত ডিসেম্বরে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং নভেম্বরে ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। দেশে দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে শীতকালীন সবজি বাজারে আসায় সবজির দাম কমে। তবে এটি ক্ষণস্থায়ী। মৌসুম শেষ হলেই সবজির দাম বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই বলা যায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির সঠিক বাস্তবায়ন সরকারের রাজস্ব সাফল্যের ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। রাজস্ব আহরণ কম হলে বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা বাড়বে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের অর্থপ্রবাহ আরো কমে যেতে পারে। এতে দেশের উৎপাদন হ্রাস পাবে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে অর্থ সরবরাহ করলে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যও অর্জন হবে না। মুদ্রানীতির শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়াতে হবে। ব্যাংক খাতের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মোট কথা, আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যাপারে তফসিলি ব্যাংকগুলোর আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে নজরদারি বৃদ্ধি করে তবে মুদ্রানীতির বাস্তবায়নের হার অনেকাংশে বাড়বে।

আরও